নানা রঙে বিরিশিরি সুসং দুর্গাপুর

15-02-2017
এশিয়া বার্তা নিউজ

নানা রঙে বিরিশিরি সুসং দুর্গাপুর

গানের দেশ, কবিতার দেশ, মহুয়া, মলুয়ার দেশ ময়মনসিংহ। এখানে আকাশ নীল, বাতাস নির্মল। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। ধানক্ষেতের হলুদ আভা মনকে করে চঞ্চল। নৌকায় নৌকায় বেদে-বেদেনিদের সংসার। যদিও সময়ের চাহিদায় তারা মূল পেশা থেকে সরে এসেছে। এই সবুজ-শ্যামলিয়ার রাজ্য কিন্তু ঢাকা থেকে খুব দূরে নয়। রাজধানীর অট্টালিকার চার দেয়ালের বেষ্টনীতে যাপিত জীবনের প্রহরগুলো কাটাতে কাটাতে যারা হাঁপিয়ে উঠেছেন, তারা বেড়িয়ে আসতে পারেন সবুজের সেই রাজ্য থেকে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার ঐতিহ্যবাহী সুসং-দুর্গাপুর থেকে।

 

পাহাড়ি এলাকার সৌন্দর্য আর আদিবাসীদের আচার-অনুষ্ঠানের কথা বললেই সবার মনে জেগে ওঠে পার্বত্য চট্টগ্রামের কথা। কিন্তু এই বহুল আলোচিত এলাকার বাহিরেও যে রয়েছে বাংলাদেশের অনেক আকর্ষণীয় স্থান, তা অনেকের কাছে অজানা-অজ্ঞাত নানা কারণে। আসুন আজ আমরা পরিচিত হই এমন একটি স্থানের সঙ্গে, যেখানে একদিকে রয়েছে প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য, অন্যদিকে সেখানকার আদিবাসীদের বিচিত্র জীবনযাত্রা, যা আপনাকে আকৃষ্ট করবে।

 

বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার সীমান্তবর্তী স্থান বিরিশিরি, সুসং ও দর্গাপুর। নেত্রকোনা জেলার একেবারে উত্তরে বিরিশিরি, সুসং ও দুর্গাপুর। পাহাড়ের কোলে বসে পাহাড় দেখার চমৎকার জায়গা। শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যই নয়, রয়েছে ইতিহাসের অমূল্য ভান্ডার। এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সোনালী অতীতের বেশ কিছু স্মৃতিচিহ্ন। অল্প সময়ে সবকিছু দেখা সম্ভব নয়।

ঢাকা থেকে নেত্রকোনা হয়ে বিরিশিরি যেতে পারেন রেল কিংবা সড়কপথে। ঢাকা থেকে সরাসরি বিলাসবহুল বাস প্রতিদিন ছেড়ে যায় বিরিশিরির উদ্দেশ্যে। সেখানে থাকার জন্য ওয়াই.এম.সি.এ কিংবা ওয়াই.ডব্লিউ.সি.এর গেস্ট হাউস। তাছাড়া রয়েছে অন্যান্য রেস্ট হাউসও।

 

বিরিশিরি, সুসং, দুর্গাপুর, বিজয়পুর, রানীখং ইত্যাদি জায়গা দেখে মুগ্ধ হবেন আপনি। সুসং ও দুর্গাপুরের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে সোমেশ্বরী নদী। ওপারে দুর্গাপুরে রয়েছে কিংবদন্তী সংগ্রামী বিপ্লবী মণি সিংহের বাড়ি। সেই বাড়িতে রয়েছে স্মৃতিসৌধ। এই জমিদারপুত্র জমিদারির স্বার্থ না দেখে দেখেছিলেন কৃষক, গারো, হাজংদের স্বার্থ।

 

এখানে আপনি দেখতে পাবেন আদিবাসী গারো ও হাজংদের। গারো পাহাড়ের নামানুসারে এখানকার  আদিম আধিবাসীদের গারো বলা হয়। গারো ভাষায় মান্দি অর্থ মানুষ এবং এ জন্য গারোরা মান্দাই নামেও পরিচিত। গারোদের আদি বাসভূমি ছিল আসাম প্রদেশে। চেহারাগত বৈশিষ্ট্য তারা আসামের খাসিয়া, নাগা ও মণিপুরিদের উত্তরাধিকারী। গারোরা মাতৃপ্রধান সম্প্রদায়। বিয়ের পর ছেলেরা শুশুরবাড়ি চলে যায়। মেয়েরা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। গারো মেয়ে-পুরুষ উভয়েই মাঠে কাজ করে। মেয়েরাই সংসারের হর্তাকর্তা। অধিকাংশ গারোই জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। ভালো ফসল উৎপাদন লাভের জন্য এরা নানা পূজা-পার্বণের আয়োজন করে থাকে। তার মধ্যে ওয়াংলাও কাওকারা প্রধান উৎসব। গারোদের পোশাক-পরিচ্ছদ খুব সাধারণ। মেয়েরা ব্লাউজ ও লুঙ্গির মতো করে টুকরো কাপড় পরিধান করে। পরুষরা ধুতি ব্যবহার করে। কার্পাস থেকে সুতা তৈরি করে তারা নিজেরাই কাপড় বোনে।

 

এখানকার আরেক উপজাতি হাজং। গারোদের মতো তারাও বহিরাগত। হাজং সম্প্রদায় গারোদের মতো মাতৃতান্ত্রিক বা মাতৃপ্রধান জাতির অন্তর্ভুক্ত নয়। হাজংরা পিতৃতান্ত্রিক সমাজভুক্ত জাতি। গারোদের মতো হাজংরা জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল নয়।

 

হাজংদের পোশাক-পরিচ্ছদ সাধারণ। মেয়েরা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ সমান টুকরো কাপড় কোমড়ে জড়ায়। প্রথমত গামছার মতো কাপড় দিয়ে বুক বাঁধে, তার ওপর ব্লাউজ ব্যবহার করে। প্রয়োজনীয় সব পণ্যদ্রব্য তারা নিজেরাই উৎপন্ন করে থাকে।

 

বিরিশিরি-দুর্গাপুর গিয়ে রানীখং সীমান্ত পর্যন্ত না গেলে আপনার ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সোমেশ্বরী নদী বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।

 

এই রানীখংয়েই রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন একটি গির্জা। বাংলাদেশের সীমানায় পাহাড়ের মাথায় চোখের সামনেই নদী। অদূরেই মেঘালয় রাজ্য। ভারতের অংশ। পাহাড়ের ওপর দিয়ে মেঘ উড়ে যায়। আপনি অনায়াসে দেখতে পাবেন মেঘের এই ওড়াউড়ি দৃশ্য।

 

রানীখংয়ের পাশেই বিজয়পুর সীমান্ত ফাঁড়ি, বিডিআর ক্যাম্প। এই বিজয়পুরেই রয়েছে চীনামাটির পাহাড়ের টিলা। যা দিয়ে চীনামাটির থালা, কাপ-পিরিচ-ফুলদানি ইত্যাদি তৈরি হয়। এসব দেখে মুগ্ধ হবেন আপনি। রোমাঞ্চ অনুভব করবেন যদি গারো হাজংদের পূজা-পার্বণ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নানা কাহিনী আপনার জানা থাকে।

সত্যিই অপূর্ব সুন্দর এই সুসং-দুর্গাপুরের প্রাচীন জনপদ। সেখানে গেলে দেখতে পাবেন রংধনুর রঙে রাঙা পাহাড়। নদী আর প্রকৃতি যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে  আছে। যেদিকে তাকানো যায় মনে হয় আকাশটা যেন পাহাড়ের বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে। মেঘমালার সঙ্গে প্রকৃতি যেন খেলা করে। এখানে অবিরাম ঝরছে পাহাড়ের বুকে ঝরনার ঝিরঝির বারিধারা।

 

ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই সুসং দুর্গাপুর। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী প্রখ্যাত নেতা কমরেড মণি সিংহ এখানে জন্মগ্রহণ করেন। এখানে সুসং রাজাদের অসংখ্য ইতিহাস জড়িয়ে আছে। সুসং রাজাদের রাজত্ব ছিল তিনশ’ বছরের বেশি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুসং রাজাদের আগে বৈশ্য গারো নামে এক পরাক্রমশালী গারো রাজা এ অঞ্চল শাসন করতেন। তার একক নেতৃত্ব রাজা সোমনাথ পাঠক মেনে নিতে পারেন নি। ফলে তিনি তার দলবল নিয়ে বৈশ্য গারোকে পরাজিত করে এ অঞ্চলকে সুসং পরগনা নাম দিয়ে ১৫৯৪ সালে শুরু করনে তাঁর রাজত্বকাল। সেই থেকে সোমনাথ পাঠক সুসং রাজাদের আদি পুরুষ হিসেবে খ্যাতি। বর্তমানে এখানে আছে সুসং রাজবাড়ি, উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি, রানীখং মিশন হাজং মাতা রাশি মণির স্মৃতিসৌধ ও কমরেড মণি সিংহের স্মৃতিবিজড়িত টঙ্ক শহীদ স্মৃতিসৌধ কমলা রানীর দিঘি।

 

এখানকার রানীখং পাহাড়টিলা যেন এক নতুন পৃথিবী। নেত্রকোনা সদর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ পাহাড়ি জনপদের বড় আকর্ষণ ‘রানীখং টিলা’ ও টিলার ওপর নির্মিত শত বছরের প্রাচীন ‘রানীখং মিশন’। সোমেশ্বরীর কূল ঘেঁষে স্থাপিত এ মিশনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ‘খ্রিষ্টীয় ক্যাথলিক ধর্মপল্লী’।

 

রানীখং মূলত একটি পাহাড়িটিলার নাম। এর নামকরণে সঠিক ইতিহাসের উল্লেখ নেই কোথাও। তবে কথিত আছে, এক সময় এই জঙ্গলকীর্ণ অঞ্চলটিতে ‘খংরানী’ নামে এক রাক্ষুসীর বসবাস ছিল। গারো অধিবাসীরা তাকে পরাস্ত করে সেখানে জনবসতি গড়ে তোলে। আর তাই রাক্ষুসী খংরানীর নামানুসারে জায়গাটির নাম হয় ‘রানীখং’।

 

রানীখং মিশন ও ক্যাথলিক গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৫ সালে। এর আগে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে (১৮৫৩) ময়মনসিংহ অঞ্চলে যিশুখ্রিষ্টের বাণী প্রচার শুরু হয়। কিন্তু দুর্গাপুরে তার সূচনা হয় আরও অনেক পরে বিশ শতকের শুরুতে। সমতল ভূমি থেকে বেশ উঁচু রানীখং টিলা। ঢালু পথ বেয়ে ক্রমশ উপরের দিকে উঠতে হয়। টিলার দক্ষিণ দিকে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার। একটু এগোলেই চোখে পড়বে ধর্মপাল বিশপ হার্থসহ পাঁচ গারো হাজং আদিবাসীর মূর্তি সংবলিত একটি নান্দনিক ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের ডানদিকে একটি ফলকে লিখে রাখা হয়েছে ধর্মপল্লী প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। ভাস্কর্যের ঠিক পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে আরেকটি মূর্তি যিশুখ্রিষ্টের।

 

সেখান থেকে একটু হাঁটলেই বাম পাশে রয়েছে শত বছরের প্রাচীন ক্যাথলিক গির্জা। পাঁচটি চূড়াসহ গির্জাটির স্থাপত্যশৈলী অনন্য। টিলার পূর্বপাশে দাঁড়িয়ে একটু নিচের দিকে তাকালে চোখে পড়বে নিচ দিয়ে প্রবাহিত সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ জলধারা। উত্তরের গারো পাহাড় থেকে ঝরনার মতো নেমে আসা এ নদীটির নাম ছিল ‘সিমলাঙ্গ’। পরে সুসং রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সোমেশ্বর পাঠকের নামানুসারে এর নাম হয় ‘সোমেশ্বরী’

নদীর স্বচ্ছ জলধারার নিচ দিয়ে স্পষ্ট দেখা যায় ‘সিলিকা বালুকণা’। নজর কেড়ে নেয় বালুকণার নিচ থেকে আদিবাসী নারী-পুরুষদের পাহাড়ি কয়লা এবং কাঠ সংগৃহের দৃশ্য। রানীখংয়ে গেলে শুধূ রানীখং টিলার সৌন্দর্য নয়, অবলোকন করা যায় আশপাশের আরও মনোমুগ্ধকর অনেক কিছু।

যাত্রার শুরুতেই দুর্গাপুরের প্রবেশপথে বিরিশিরি এলাকায় দেখা যাবে স্থানীয় আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র কালচারাল একাডেমি এবং বেশ কয়েকটি গির্জা। দুর্গাপুর শহরের মধ্যে  রয়েছে সুসং রাজবাড়ি, রাজাদের নানা নিদর্শন এবং কমরেড মণি সিংহের স্মৃতিবিজড়িত স্মৃতিসৌধ।

ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘তীর ধনুক’ আকৃতির স্মৃতিসৌধটি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের আন্দেলন-সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এছাড়াও রানীখংয়ের সামান্য উত্তরে রয়েছে বিজয়পুরের চীনামাটির খনি। খনিজ এলাকায় পাহাড় কেটে মাটির গর্ত থেকে প্রতিদিন সাদা, লাল, বেগুনি, নীল রঙের চীনামাটি তুলে আনেন হাজার হাজার শ্রমিক। এ মাটি দিয়েই তৈরি হয সিরামিকের জিনিসপত্র। বিজয়পুর রয়েছে স্থল শুল্ক বন্দর। বিজিবি ক্যাম্প। এরপরই শুরু হয়েছে ভারত সীমান্ত।

 

বিরিশিরি, সুসং, দুর্গাপুর যেন বিধাতার অপরুপ সৃষ্টি। পাহাড়ি নদী আর ভিন্ন ভিন্ন জাতির এক সঙ্গে বসবাস যেন পুরো এলাকাকে সাজিয়ে রেখেছে এক নান্দনিকরুপে। এখানে বাস করে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান সহ ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর গারো, হাজং, কোচসহ নানা প্রজাতির মানুষ। অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি আপনাকে একাধারে দেবে আনন্দ, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা, যা জীবনে স্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে।

সর্বশেষ সংবাদ